অংশীদারি ফার্মের বিলুপ্তি ও আইনি প্রক্রিয়া

by Ain Sheba 20 October 2026

ভূমিকা

বাংলাদেশে একটি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ বা অবলুপ্ত করতে হলে কেবল অংশীদারদের নিজেদের সম্মতি বা সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। ব্যবসাটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে নেওয়ার জন্য অংশীদারি আইন, ১৯৩২-এর অধীন বিলুপ্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি আয়কর আইন, ২০২৩ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর অধীন যাবতীয় প্রশাসনিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা মেটাতে হয়। সঠিক প্রক্রিয়ায় এই আইনি ধাপগুলো সম্পন্ন না করলে প্রাক্তন অংশীদারদের ওপর ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের দায়, কর বকেয়ার দাবি বা আইনি জটিলতার ঝুঁকি থেকে যায়।

অংশীদারি আইন, ১৯৩২-এর অধীনে বিলুপ্তির পদ্ধতি

১৯৩২ সালের অংশীদারি আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ফার্মের সকল অংশীদারের মধ্যকার অংশীদারি সম্পর্কের অবসানকে উক্ত ফার্মের ‘বিলুপ্তি’ বলা হয়।

  • পারস্পরিক সম্মতিতে বিলুপ্তি (ধারা ৪০): ফার্মের সকল অংশীদারের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অথবা অংশীদারি দলিলের শর্তানুসারে একটি ফার্ম বিলুপ্ত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে অংশীদারদের একটি লিখিত ‘বিলুপ্তি চুক্তি’ সম্পাদনা করা উচিত, যেখানে ক্যাপিটাল, মুনাফার অংশ, পাওনাদারদের দায় পরিশোধ ও সম্পদের বণ্টন স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
  • বাধ্যতামূলক ও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিলুপ্তি (ধারা ৪১ ও ৪২): সকল বা একজন ব্যতীত সকল অংশীদার দেউলিয়া ঘোষিত হলে কিংবা ফার্মের ব্যবসাটি বেআইনি হয়ে পড়লে আইনত বাধ্যতামূলক বিলুপ্তি ঘটে। এছাড়া নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হওয়া, কোনো নির্দিষ্ট কাজ শেষ হওয়া বা অংশীদারের মৃত্যু ঘটলেও চুক্তি সাপেক্ষে বিলুপ্তি ঘটতে পারে।
  • বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিলুপ্তি (ধারা ৪৩): ইচ্ছাধীন অংশীদারির ক্ষেত্রে যেকোনো অংশীদার অন্য সকল অংশীদারকে বিলুপ্তির অভিপ্রায় জানিয়ে লিখিত নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে ফার্মের বিলুপ্তি ঘটাতে পারেন।
  • আদালতের আদেশে বিলুপ্তি (ধারা ৪৪): কোনো অংশীদারের মানসিক অসুস্থতা, স্থায়ী অক্ষমতা, ব্যবসায়িক আচরণগত অপরাধ, কিংবা ক্রমাগত লোকসানের কারণে সংক্ষুব্ধ অংশীদার আদালতের শরণাপন্ন হয়ে বিলুপ্তির আদেশ নিতে পারেন

অংশীদারি বিলুপ্তি দলিলের স্ট্যাম্প ফি

অংশীদারগণ যখন পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন লিখিত ‘বিলুপ্তি চুক্তিপত্র’ বা ‘অংশীদারি অবলুপ্তি দলিল’ (Deed of Dissolution of Partnership) প্রস্তুত করতে হবে এবং স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯-এর বিধান অনুযায়ী ২০০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদন করা বাধ্যতামূলক। অপর্যাপ্ত স্ট্যাম্প বা সাধারণ কাগজে প্রস্তুতকৃত চুক্তিপত্র আইনত আদালতে প্রমাণের দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় না। আরজেএসসিতে (RJSC) ‘ফর্ম VI’ জমা দেওয়ার সময় এবং ব্যাংক বা কর কর্তৃপক্ষের নিকট বিলুপ্তির বৈধ প্রমাণ দাখিল করার ক্ষেত্রেও এই সঠিকভাবে স্ট্যাম্পকৃত অবলুপ্তি দলিল উপস্থাপন করতে হয়।

পাবলিক নোটিশ বা সাধারণ বিজ্ঞপ্তি (ধারা ৪৫ ও ৭২): ধারা ৪৫ অনুযায়ী, সাধারণ বিজ্ঞপ্তি জারি না করা পর্যন্ত প্রাক্তন অংশীদারগণ ফার্মের পূর্ববর্তী ক্রিয়াকলাপের জন্য তৃতীয় পক্ষের নিকট দায়ী থাকেন। নিবন্ধিত ফার্মের ক্ষেত্রে RJSC-কে অবহিত করা, সরকারি গেজেট এবং সংশ্লিষ্ট জেলার একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার মাধ্যমে এই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়।

RJSC ও ফর্ম VI (ধারা ৬৩): ফার্মটি Registrar of Joint Stock Companies and Firms (RJSC)-এ নিবন্ধিত হলে, ধারা ৬৩(১) অনুযায়ী নির্দিষ্ট ‘ফর্ম VI’ (Form VI – Notice of Intimation for Dissolution) পূরণ ও স্বাক্ষর করে বিলুপ্তির চুক্তিপত্রসহ আরজেএসসিতে জমা দিতে হয় ।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর অধীনে কর ফাইল (e-TIN) নিষ্পত্তিকরণ

অংশীদারি ব্যবসা বন্ধ হলেও ফার্মের আয়কর সংক্রান্ত দায়স্বীকার বা বকেয়া স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে উঠে যায় না। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৯১(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো অর্থবছরে ব্যবসা বন্ধ হলে ব্যবসা বন্ধের ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারকে (DCT) লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে এবং উক্ত সময়কাল পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর চূড়ান্ত আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

  • অংশীদারদের অব্যাহত যৌথ ও পৃথক দায় (ধারা ২৫৬): ধারা ২৫৬(১) ও ২৫৬(২) অনুযায়ী, ফার্ম বিলুপ্ত হলেও ব্যবসা চালুকালীন সময়ের অর্জিত আয়ের ওপর কর নির্ধারণ করা যাবে এবং বকেয়া কর বা জরিমানা পরিশোধের জন্য অংশীদারগণ (বা কোনো অংশীদারের মৃত্যু হলে তার আইনি প্রতিনিধিগণ) যৌথভাবে এবং পৃথকভাবে দায়ী থাকবেন।
  • ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (ধারা ২৫৬(৩)): আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৫৬(৩) ধারার নতুন বিধান মতে, আরজেএসসিতে নিবন্ধিত কোনো অংশীদারি ফার্মের বিলুপ্তি কার্যকর করতে হলে উপকর কমিশনারের নিকট থেকে ইস্যুকৃত ‘ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ আরজেএসসিতে দাখিল করতে হবে। এই সনদ দাখিল করার পরই আরজেএসসি কর্মকর্তা ফার্মের বিলুপ্তির আদেশ লিপিবদ্ধ করবেন
  • চূড়ান্ত হিসাব ও অডিট: ফার্মের আয়ের ধরণ ও আইনগত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী চূড়ান্ত সমাপনী হিসাবপত্র (Closing Accounts) তৈরি ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট দ্বারা নিরীক্ষিত (Audited Financial Statements) আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে হয়।

ভ্যাট আইন, ২০১২ ও বিধিমালা, ২০১৬-এর অধীনে BIN বাতিল

ভ্যাট নিবন্ধিত ফার্মকে ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ড বন্ধের পর পৃথকভাবে ভ্যাট ফাইল ও বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (BIN) বাতিলের পদক্ষেপ নিতে হয় ।

  • আবেদন ও ফর্ম ভ্যাট-২.৪ (ধারা ৯ ও বিধি ৮): মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৯ ধারা এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর ৮(১) বিধি অনুযায়ী অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে ‘ফর্ম ভ্যাট-২.৪’ (Form VAT-2.4)-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট সার্কেল কার্যালয়ে বিন (BIN) বাতিলের আবেদন করতে হয়।
  • চূড়ান্ত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও নিস্পত্তি: আবেদনের পর ভ্যাট কর্তৃপক্ষের নিরীক্ষা ও নির্দেশনানুসারে চূড়ান্ত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হয় এবং সমস্ত বকেয়া পরিশোধান্তে ভ্যাট কর্মকর্তা ১৫ দিনের মধ্যে বিন (BIN) বাতিলের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
  • বকেয়া দায়ভার: ভ্যাট বিন (BIN) বাতিল হলেও ব্যবসা পরিচালনাকালীন সময়ের অনাদায়ী ভ্যাট, বকেয়া বা জরিমানার দায় বিলুপ্ত হয় না।৫. অন্যান্য স্থানীয় লাইসেন্স সমর্পণ

অন্যান্য স্থানীয় লাইসেন্স সমর্পণ

ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাইলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সার্বিক কার্যক্রম সমাপ্তির অংশ হিসেবে নিম্নলিখিত স্থানীয় লাইসেন্সগুলো সমর্পণ বা বাতিল করতে হয়:

  • ট্রেড লাইসেন্স সমর্পণ: সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার আঞ্চলিক কার্যালয়ে লিখিত আবেদন ও ফি পরিশোধ করে ট্রেড লাইসেন্স সমর্পণ করতে হয়।
  • আইআরসি (IRC) ও ইআরসি (ERC) বাতিল: ফার্মের নামে কোনো আমদানি বা রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (IRC/ERC) থাকলে তা প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে (CCI&E) সমর্পণ করে বাতিল করতে হয়, কারণ এগুলো e-TIN ও BIN-এর সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকে।

উপসংহার

বাংলাদেশে একটি অংশীদারি ফার্ম সফলভাবে গুটিয়ে নেওয়ার অর্থ কেবল অংশীদারদের চুক্তি সই করা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আরজেএসসিতে ফর্ম VI দাখিল, সরকারি গেজেট ও পত্রিকায় পাবলিক নোটিশ প্রকাশ, উপকর কমিশনার হতে ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ এবং ভ্যাট বিন (BIN) সমর্পণ—এই সকল ধাপ সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমেই প্রাক্তন অংশীদারগণ ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা বা আর্থিক দায়ভার থেকে ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারেন