পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪-এ ‘পরিশোধ’ সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও সংজ্ঞা রয়েছে যা আর্থিক লেনদেনকে সুসংহত করার জন্য অপরিহার্য।

এই আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘পরিশোধ ব্যবস্থা’ এবং ‘পরিশোধ সেবা’র আইনি ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, এবং পঞ্চম অধ্যায়ে পরিশোধের পদ্ধতি ও চূড়ান্ততা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
আইনের ধারা ২ অনুযায়ী, ‘পরিশোধ সেবা’ বলতে নগদ জমা ও উত্তোলন, অর্থ স্থানান্তর, পরিশোধ দলিল ইস্যু করা, ইলেকট্রনিক মুদ্রা স্থানান্তর বা পরিশোধ সংক্রান্ত অন্যান্য সহায়ক সেবাগুলোকে বোঝানো হয়েছে । অন্যদিকে, ‘পরিশোধ ব্যবস্থা’ বলতে এমন একটি প্রক্রিয়া বা সিস্টেমকে বোঝানো হয়েছে যা একটি প্রেরক ও একজন সুবিধাভোগীর মধ্যে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করতে সক্ষম, যার মধ্যে নিকাশ (Clearing), পরিশোধ (Payment) বা নিষ্পত্তি (Settlement) সেবার যেকোনো একটি বা সবগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে । এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, স্মার্ট কার্ড, অর্থ স্থানান্তর এবং একই ধরনের অন্যান্য কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ।
- লাইসেন্সিং এবং অনুমোদন: এই আইনটি ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি কোনো পরিশোধ ব্যবস্থা পরিচালনা বা পরিশোধ সেবা প্রদান করতে পারবে না।
- আউটসোর্সিং এবং এজেন্ট নিয়োগ: এই আইনের ৯ ও ১০ নং ধারায় আউটসোর্সিং এবং এজেন্ট নিয়োগের বিধানগুলোকে আইনিভাবে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে । ব্যাংক বা অন্য কোনো পরিশোধ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যখন তাদের কার্যক্রমের কোনো অংশ অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ বা এজেন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তখন সেই কার্যক্রমগুলোও এই আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি আইনি তদারকির আওতায় আসবে। এর ফলে, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ন্ত্রকের তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, যা জালিয়াতি এবং নিম্নমানের পরিষেবার মতো ঝুঁকি কমায়। আইনটি গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষার জন্য নথিপত্র সংরক্ষণ এবং তথ্যের গোপনীয়তাও বাধ্যতামূলক করেছে ।
- লাইসেন্সিংয়ের পরিধি: এই আইনের ১৫ নং ধারায় বলা মাধ্যমে হয়েছে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান যার কার্যক্রম “পরিশোধ সেবার জন্ম দিতে পারে”, তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিতে হবে । এর মাধ্যমে, প্রচলিত ব্যাংকের বাইরে থাকা সমস্ত ডিজিটাল পেমেন্ট সরবরাহকারীকে একই আইনি ছাতার নিচে আনা হয়েছে।
- পরিশোধ নির্দেশ: এই আইনের অধীনে পরিশোধ নির্দেশ অনুমোদন ও প্রত্যাহার করার বিধান রয়েছে। এটি অননুমোদিত পরিশোধ নির্দেশ কার্যকর হওয়ার প্রতিকারও প্রদান করে ।
- লেনদেনের চূড়ান্ততা: আইনের পঞ্চম অধ্যায়ে লেনদেনের নিষ্পত্তির চূড়ান্ততা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে । একবার কোনো লেনদেন নিষ্পত্তি হলে বা নিষ্পত্তির জন্য অনুমোদিত হলে, তা আর বাতিল করা যাবে না। এমনকি যদি কোনো সংশ্লিষ্ট কোম্পানি দেউলিয়া বা অবসায়নেও যায়, তাহলেও এই চূড়ান্ততা বজায় থাকবে । এটি আর্থিক লেনদেনে উচ্চ মাত্রার নিশ্চয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। এমনকি পরিশোধের দায় নিষ্পত্তির জন্য জামানত ব্যবহারের বিধানও রাখা হয়েছে ।
- অপরাধ ও দণ্ড: আইনটির বিভিন্ন বিধান লঙ্ঘনের জন্য কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা । এই আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হলো ৩৯ নং ধারা, যা এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য (cognizable), অজামিনযোগ্য (non-bailable) এবং অ-আপসযোগ্য (non-compoundable) হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করে । এই আইনি শ্রেণিবিভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে, অপরাধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে এবং ডিজিটাল আর্থিক বাজারে জনআস্থা বাড়াতে সাহায্য করে
এই আইনটি বাংলাদেশে একটি সুসংহত এবং নিরাপদ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে ।
